রোববার   ২৪ নভেম্বর ২০২৪   অগ্রাহায়ণ ৯ ১৪৩১   ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৬

মাদক ও অপরাধের স্বর্গরাজ্য নিউইয়র্ক

হাসান মাহমুদ

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:৪০ এএম, ২২ জুন ২০২৪ শনিবার

ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষণ আতঙ্কিত নগরবাসী


ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি ও ধর্ষণের ঘটনায় আতঙ্কিত নিউইয়র্কের মানুষ। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এ শহর এখন মাদকে ছেয়ে গেছে। সব ধরনের অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে নিউইয়র্ক। দিন দিন অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। প্রশাসন নির্বিকার। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
সর্বগ্রাসী  মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটে চলেছে নিউইয়র্ক সিটি জুড়ে। মাদককে কেন্দ্র করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হচ্ছে মারাত্মক সব অপরাধ। ম্যানহাটানের মিডটাউন সাউথ প্রিসিংটের অন্তর্গত নাইনথ এভিনিউ থেকে লেক্সিংন্টন পর্যন্ত এলাকায় গত বছরের চেয়ে মাদকাসক্তের সংখ্যা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে এনওয়াইপিডি’র এক তথ্যে জানা গেছে। এছাড়া চলতি বছরের ছয় মাসে এই এলাকায় ১৭২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। মারাত্মক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে ২৪৫টি। যা গত বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতিতে এলাকার অধিবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তারা এই এলাকাকে আইনবিহীন একটি ‘অনাচারপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে দেখছেন।  
এদিকে কুইন্সের একটি পার্কে ১৩ বছর বয়সী স্কুল পড়–য়া এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ইগনা লিন্ডি (২৫) নামের এক ব্যক্তি ছুরির ভয় দেখিয়ে বর্বরভাবে তাকে ধর্ষণ করেছে বলে জানিয়েছে এনওয়াইপিডি। ধর্ষণের শিকার শিশুটি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ইগনা লিন্ডি টেক্সাস বর্ডার দিয়ে তিন বছর আগে অবৈধভাবে নিউইয়র্কে আসে। শিশু ধর্ষণের এই ঘটনা নিয়ে গত কয়েকদিন এনওয়াইপিডিতে তোলপাড় চলছিল। লিন্ডির বুকে আঁকা ড্রাগনের একটি টাট্টু থেকে তাকে চিহ্নিত করে পুলিশ। আটক করার পর জ্যাকসন হাইটসের এলমহার্টস হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে। লিন্ডি পুলিশকে জানিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের মাদকে সে আসক্ত। আসলে সে মাদক নিতে নিতে ‘সাইকোপ্যাথে’ পরিণত হয়েছে বলে  নিউইয়র্কের  পুলিশ কমিশনার এডওয়ার্ড ক্যাবেন বুধবার জানিয়েছেন।
ভয়াবহ এসব মাদকের কারবার ম্যানহাটান ছাড়াও কুইন্স, ব্রঙ্কস এবং ব্রুকলিনে ছড়িয়ে আছে। ম্যানহাটানের মিডটাউনের এইটথ এভিনিউ এলাকাটি সবার কাছে ‘অপরাধরাজ্য’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জানা গেছে, ম্যানহাটানের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল ও পেন স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন মাদক ডিলার ও মাদকাসক্ত সাইকোপ্যাথদের দ্বারা সংঘটিত কোন না কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রচুর সংখ্যক বিদেশি পর্যটক এই এলাকায় থাকেন। তারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন মাদক অপরাধীদের দৌরাত্ম্যে। রাতে পর্যটকরা বাইরে বের হতে সাহস পান না। ‘নাইন ওয়ান ওয়ান’ নম্বরে কল দিলে পুলিশ সব ঘটনা শুনেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না বলে অভিয়োগ রয়েছে।  
এখানে  দিনদুপুরে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে, মাদক ডিলার ও ক্রেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে ছুরি হামলা বা গুলির ঘটনা ঘটছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে জোর করে পণ্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাদকাসক্ত সাইকোপ্যাথরা তাদের ঘাঁটি হিসেবে এই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে।
এইটথ এভিনিউয়ের ওয়েস্ট ৩৯ স্ট্রিটে নিজের ব্যবসা পরিচালনা করেন বাংলাদেশি আমেরিকান অরুণ কুমার (৪৫)। তিনি বলেন, এমন কোন দিন নেই স্টোরে চুরি হয় না। দুর্র্বৃত্তরা ফ্রিজ থেকে বিয়ারসহ নানা খাবার নিয়ে নির্বিঘেœ চলে যায়। তাদের কিছু বলতে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাতে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা হয়তো ছুরি মারতে পারে; নয়তো গুলি করতে পারে। অরুণ কুমারের স্টোরটি পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল এবং পেন স্টেশনের মাঝে অবস্থিত। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে এখানে ভয়াবহ সব মাদকের বেচাকেনার হাট বসে। গাঁজা নিউইয়র্কের বৈধ এবং অবৈধ সব দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। এই সিটিতে গাঁজা ব্যবহারে কোন বিধিনিষেধ নেই। গাঁজার গন্ধে নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটা যায় না। নিষিদ্ধ অন্যসব ভয়াবহ মাদকের বেচাকেনা নিয়ে ঘটে অপরাধমূলক বড় সহিংস ঘটনা।
জানা গেছে, মাদক নিয়ে এখানে প্রকাশ্যে সহিংস ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। ড্রাগ ডিলার এবং ক্রেতাদের মধ্যে রক্তারক্তি প্রায়ই হয়ে থাকে। গত সপ্তাহে পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের পাশে একজন মহিলা ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ওয়েস্ট ৩৩ স্ট্রিট এবং ব্রডওয়েতে একই সময়ে একজন পুরুষ গুলিবিদ্ধ হন। এই পথ দিয়ে হেঁটে যেতেও কেউ নিরাপদ বোধ করেন না।
ইয়াং লু (৩৪) নামের এক গ্রোসারি কর্মী জানান, এখানে মাদকের ডিপো, ভয়াবহ সব অপরাধ, হোমলেসদের উৎপাত, ড্রাগ কিউর ক্লিনিক এবং শেল্টারগুলোর অবস্থান। তিনি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তাদের দুর্র্বৃত্তায়ন ঠেকানো যায় না। এখানে টাইমস স্কয়ার এবং ট্রানজিট বাস টার্মিনালে আসা পর্যটকরা তাদের টার্গেটে পরিণত হয়। হোমলেসরা ডলারের জন্য পর্যটকদের পেছন পেছন হাঁটে এবং আদায় করেই ছাড়ে। এতে করে নিউইয়র্কের ইমেজ বিদেশি পর্যটকদের কাছে নষ্ট হচ্ছে।
ইটালি থেকে প্রথমবার নিউইয়র্কে আসা একজন পর্যটক হিলরিয়া রুটিনি (৩২) এবং তার স্বামী ফিলিপপো প্যারাডিসু (৩৯)। তারা বলেন, ম্যানহাটানের ওই এলাকাটি অত্যন্ত বিপদজনক। রাতে আমরা ওখান দিয়ে হাঁটি না। আতঙ্কিত হবার মতো সব ঘটনা ঘটে থাকে। পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের কাছের একটি হোটেলে ইটালি থেকে আসা পর্যটক দম্পতি উঠেছেন। তারা বলেন, রাতে পুরো এলাকায় মাদকাসক্তদের বাজার বসে যায়। পুলিশকে ফোন দিয়ে কোন কাজ হয় না বলে তারা অভিযোগ করেন।  
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নিউইয়র্ক সিটিতে গাঁজা বিক্রি করা হয় এমন অবৈধ ৪ শতাধিক দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্কে মাদকের নানা ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এরিক অ্যাডামস ‘নিউইয়র্ক পোস্ট’কে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘এনওয়াইপিডির হাত আইন দ্বারা শক্ত করে বাঁধা আছে। তার মধ্যেও অফিসাররা অনেক ভাল কাজ করছেন।’