শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫   চৈত্র ২১ ১৪৩১   ০৫ শাওয়াল ১৪৪৬

ট্রাম্প কি আসলেই তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ১২:৪১ পিএম, ২ এপ্রিল ২০২৫ বুধবার

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে চান বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে যে তিনি ‘মশকরা’ করছেন না, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। যদিও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তবে ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলছেন, কিছু উপায় থাকতে পারে, যার মাধ্যমে তিনি তৃতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফিরতে পারেন।

তৃতীয় মেয়াদ নিয়ে ট্রাম্প যা বলছেন

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তাঁর তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘কিছু উপায় আছে, যেগুলো কাজে লাগিয়ে আপনি এটি (তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়া) করতে পারবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মশকরা করছি না... অনেক মানুষই চান, আমি এটা করি। তবে আমি মূলত তাঁদের বলেছি, আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। আপনি জানেন, আমরা প্রশাসনের জন্য একেবারে শুরুর দিকে রয়েছি।’

ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসেন। এবারের মেয়াদ শেষে তাঁর বয়স হবে ৮২ বছর। সাক্ষাৎকারে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি দেশের ‘সবচেয়ে কঠিন পদে দায়িত্ব পালন’ করে যেতে চান কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কাজ করতে পছন্দ করি।’

এটি প্রথমবার নয়, যখন ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদ নিয়ে কথা বলেছেন। গত জানুয়ারিতে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘একবার নয়—দুই, তিন বা চারবারের মতো (প্রেসিডেন্ট পদে থেকে দেশের) সেবা করা আমার জীবনের সবচেয়ে সম্মানজনক কাজ হবে।’ যদিও সে সময় তিনি এটিকে ‘ভুয়া গণমাধ্যমের জন্য’ একটি রসিকতা বলে উল্লেখ করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান কী বলে?

মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে দুবারের বেশি নির্বাচিত হতে পারবেন না।

যদি ট্রাম্প সংবিধান পরিবর্তন করতে চান, তাহলে তাঁকে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের অনুমোদন পেতে হবে। পাশাপাশি, অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সরকারগুলো থেকে তিন-চতুর্থাংশ অনুমোদনেরও প্রয়োজন পড়বে।

গত ৫ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এখন ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির হাতে। তবে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই তাদের। আর অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের ৫০টি আইনসভার মধ্যে ১৮টি বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

প্রতিনিধি পরিষদে টেনেসি অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সদস্য অ্যান্ডি অগলেস গত জানুয়ারিতে একটি প্রস্তাব এনেছিলেন, যাতে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল।


ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলছেন, মার্কিন সংবিধানে একটি ফাঁক রয়েছে। তাঁদের যুক্তি হলো—২২তম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচিত’ হতে পারবেন না। তবে শূন্য পদ পূরণের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিষয়ে কিছু বলা নেই।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারেন। যদি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত প্রার্থী (যেমন জেডি ভ্যান্স) শপথ নেওয়ার পরপরই পদত্যাগ করেন, তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন।

আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেমের অধ্যাপক ড্রেক মুলারের মতে, সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী অনুযায়ী, দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা ব্যক্তি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদেও অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। অর্থাৎ, এই কৌশল কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের তৃতীয় মেয়াদ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইনবিষয়ক অধ্যাপক জেরেমি পল বলেন, প্রেসিডেন্টের তৃতীয় মেয়াদের পক্ষে ‘বিশ্বাসযোগ্য কোনো আইনি যুক্তি’ নেই।

১৯৪৫ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সংবিধানের ২২তম সংশোধনী যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর আগে, ১৭৯৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটন স্বেচ্ছায় তৃতীয় মেয়াদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

কেউ কি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট ছিলেন?

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একমাত্র ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে তাঁর চতুর্থ মেয়াদের তিন মাসের মাথায় তিনি মারা যান। তাঁর শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রে মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল।

সে সময় মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের মেয়াদসংক্রান্ত কোনো বিধিনিষেধ ছিল না, তবে দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট না হওয়াটা একটি প্রথা হিসেবে চলে আসছিল। রুজভেল্ট সেই প্রথা ভেঙে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ১৯৫১ সালে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে তাঁর সমর্থকেরা বিকল্প উপায়ের কথা বলছেন। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া এটি সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে কী সিদ্ধান্ত নেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এর কী প্রভাব পড়ে। খবর: বিবিসি