দাওয়াত দেয়া ও গ্রহণের আদব
আমাদের নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৪:৫৮ পিএম, ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ বুধবার
দাওয়াতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। দাওয়াত কবুল করা মুসলমানের হক হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
দাওয়াত কবুলের জন্য শর্ত:
এক্ষেত্রেও কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। যে দাওয়াতে গেলে গুনা লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে দাওয়াত কবুল করা সুন্নত নয়। কেননা সুন্নতের ওপর আমল করতে গিয়ে কবীরা গুনাহতে লিপ্ত হওয়া যাবে না। বিয়ের কার্ডে লেখা থাকে ‘সুন্নাতে ওলীমা’। ভালো কথা, ওলীমা তো অবশ্যই সুন্নত। কিন্তু কোন ধরণের ওলীমা সুন্নত? মূলত: সুন্নত তরীকার ওলীমাই সুন্নত। যে ওলীমায় নারী-পুরুষ অবাধ চলাফেরা হয়, পর্দা লংঘন হয়, সেই ওলীমা কখনই সুন্নত নয়।
আত্মসমর্পণ আর কত দিন?
এসব কিছু কেন হচ্ছে? কারণ আমরা বিভিন্ন প্রথা ও গুনাহের সামনে নেতিয়ে পড়েছি। ফলে অন্যায়, অপরাধ, অবৈধতা ও অশ্লীলতা সমাজে ছাড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহর কোনো বান্দা যদি বেঁকে বসতেন এবং নিজ সম্প্রদায়কে সাফ সাফ বলে দিতেন যে, দাওয়াতের নামে যদি অন্যায় ও অশ্লীলতা হয়, তাহলে এ ধরণের দাওয়াতে আমি নেই। এ জাতীয় কথা বলার মত লোক থাকলে এসব সামাজিক প্রথা ও অন্যায় এতটুকু অবশ্যই ছড়াত না। কিন্তু বর্তমানে তো মানুষ উল্টো পথে চলছে।
যদি বলা হয়, যে দাওয়াতে শালীনতা ও পর্দা নেই, সে দাওয়াতে যেও না। উত্তর দেবে, না গেলে সমাজে আমার নাক কাটা যাবে। আমি বলি, গুনাহমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে যদি তোমার নাক কাটা যায়, তাহলে যেতে দাও। এ কাটাকে তুমি সাধুবাদ জানাও। কারণ এই ‘কর্তন’ আল্লাহর জন্য হয়েছে বিধায় এটি পবিত্র। অতএব বলে দাও, আমাদেরকে দাওয়াত দিতে হলে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক পৃথক ব্যবস্থা করতে হবে। পর্দা বিধান নিরাপদ থাকবে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে। অন্যথায় আমরা যাব না। এরপরেও যদি তারা তোমার কথা না মানে, তাহলে যে ব্যক্তি তোমার কথার গুরুত্ব দেয়নি, তুমি তার দাওয়াতের গুরুত্ব দেবে কেন?
এ ধরণের কিছু সৎসাহসী লোক তৈরি হওয়া উচিত। কিন্তু তৈরি তো হচ্ছে না, বরং যে মানুষটি দ্বীনের ওপর চলতে যথেষ্ট আগ্রহী, সেও চক্ষু লজ্জার কারণে বলতে পারে না। সে ভয় করে যে, আমি যদি বেঁকে বসি, আমাকে সেকেলে ও পশ্চাদমুখী মনে করবে। এভাবে আর কতদিন চলবে অবক্ষয়ের এ স্রোত? কত দিন তুমি এসব অন্যায় কাজের অনুকুলে থাকবে? তোমাদের নীরব ভূমিকার কারণে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আর যুবতীরা নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। পশ্চিমা সভ্যতার অভিশাপ গোটা সমাজকে পিষে ফেলছে। এভাবে তো আর চলতে দেয়া যায় না। তাই পদক্ষেপ নাও। প্রতিজ্ঞা কর, গুনাহের সয়লাব যেখানে, আমরা নেই সেখানে।
প্রয়োজন শুধু সৎ সাহসের:
অনেক সময় মনে করা হয়, অনুষ্ঠানাদিতে পর্দানশীন থাকে দু’একজন। তাই আলাদা আয়োজন এক অতিরিক্ত ঝামেলা। মনে রাখবেন, ঝামেলা মনে করলে ঝামেলা। অন্যথায় এটা খুব একটা সমস্যার কিছু নয়। প্রয়োজন শুধু সৎ সাহসের এবং সৎ চিন্তার।
দাওয়াত কবুল করার শরয়ি বিধান:
শরীয়তের বিধান হলো, দাওয়াতে গেলে যদি গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই দাওয়াতে যাওয়া জায়েয নেই। আশঙ্কা না থাকলে সে দাওয়াতে অংশগ্রহণ করার অবকাশ আছে। যদি মনে করা হয়, দাওয়াতের সুবাদে কিছু অশ্লীলতা চলবেই, তবে আমি নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারব, তাহলেও অংশগ্রহণের অবকাশ আছে। কিন্তু যারা সমাজের নেতৃস্থানীয় অথবা যাদের প্রতি সমাজ তাকিয়ে থাকে, তাদের জন্য এ জাতীয় দাওয়াতে অংশগ্রহণ মোটেও জায়েয হবে না। এ হলো, দাওয়াত কবুল করার মূলনীতি। এ নীতি মতেই চলতে হবে।
দাওয়াতের জন্য নফল রোজা ভঙ্গ করা:
আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে তিনি যদি রোজাদার হন এবং রোজার কারণে খাবার খেতে না পারেন, তাহলে মেজবানের জন্য দোয়া করবেন। এর আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি নফল রোজা অবস্থায় নিমন্ত্রিত হয়, তাহলে নিমন্ত্রণ কবুল করার লক্ষ্যে তথা এক মুসলমানের অন্তর খুশি করার লক্ষ্যে নফল রোজা ভাঙ্গতে চাইলে তার অনুমতি আছে। পরবর্তীতে এর কাযা করে নেবে। আর রোজা ভাঙ্গতে না চাইলে অন্তত মেজবানের জন্য দোয়া করবে।
যে মেহমানকে দাওয়াত দেয়া হয়নি তার বিধান:
عن ابى مسعود البدرى رضى الله عنه قال: دعا رجل النبى صلى الله عليه وسلم لطعام صنعه له خامس خمسة، فتبعهم رجل، فلما بلغ الباب قال النبى صلى الله عليه وسلم إن هذا تبعنا فان شئت ان تأذن وإن شئت رجع، قال : بل أذن له يا رسول الله
‘হজরত আবু মাসউদ বদরী (রা.) বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত দিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে আরো চার জন ছিল। ওই যামানায় কোনো লৌকিকতা ছিল না বিধায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় নিজের সঙ্গে আরো দু’একজন নিয়ে নিতেন। এখানে লোকটি দাওয়াত দিয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ মোট পাঁচজনকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাওয়াত খাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন, পথিমধ্যে আরেকজন যোগ হয়ে গেল। আজকাল যেমনিভাবে কোনো বুযুর্গকে দাওয়াত দেয়া হলে সঙ্গে আরো দু’একজন আসেন। যখন তিনি মেজবানের বাড়িতে পৌঁছলেন, মেজবানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এ ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে চলে এসেছে। তুমি চাইলে তাকে মেহমান হওয়ার অনুমতি দিতে পার। অন্যথায় সে ফেরত চলে যাবে। মেজবান বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলাম।’ (বুখারী, হাদীস নং- ১৯৩৯, মুসলিম, হাদীস নং- ৩৭৯৭)
ওই ব্যক্তি চোর ও ডাকাত:
এ হাদীসের মাঝে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে শিক্ষাটি রয়েছে, তা হলো কারো বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলে যদি তোমার সঙ্গে এমন ব্যক্তিও যায়, যার দাওয়াত নেই, তাহলে প্রথমে মেজবানের অনুমতি নিয়ে নেবে, তারপর দাওয়াত খাবে। কেননা এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বিনা দাওয়াতে চলে আসে, সে যেন চোর হয়ে আসল আর ডাকাত বনে চলে গেল।
মেজবানের অধিকার:
মূলত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত শিক্ষার মাধ্যমে একটি মূলনীতির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। যে মূলনীতিটি আমাদের কাছে অবহেলিত। আমাদের ধারণা হলো, আতিথ্যের সব মেজবানের ওপর মেহমানের পাওনা। মেহমানের আতিথেয়তা করা এবং যথাযথ কদর করা মেজবানের কর্তব্য। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসের মাধ্যমে এ শিক্ষা দিয়েছেন, যেমনিভাবে মেহমানের অধিকার আছে, অনুরূপভাবে মেজবানেরও অধিকার রয়েছে। মেহমান মেজবানকে অযথা কষ্ট দিতে পারবে না। যেমন মেহমান নিজের সঙ্গে এমন লোক নিতে পারবে না, যার দাওয়াত নেই। হ্যাঁ, মেহমানের যদি নিশ্চিত বিশ্বাস থাকে যে, লোকটিকে নিয়ে গেলে মেজবান অসন্তুষ্ট হবেন না, বরং সন্তুষ্টই হবেন, তাহলে ভিন্ন কথা। এরূপ ক্ষেত্রে তাকে সঙ্গে নিতে পারবে।
পূর্ব থেকে অবগত করে রাখবে:
মেজবানের আরেকটি হক হলো, মেহমান হতে চাইলে মেজবানকে আগেই জানিয়ে দেবে। কমপক্ষে এমন সময় হতে হবে, যেন খানা-পিনার ব্যবস্থা করতে অসুবিধা না হয়। ঠিক খানার মুহুর্তে উপস্থিত হলে মেজবান তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খাবেন। সুতরাং অসময়ে মেহমান হওয়া উচিত নয়। এটা মেহমানের ওপর মেজবানের হক। মেহমান অনুমতি ছাড়া রোজা রাখবে না:
এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মেজবানকে অবহিত করা ছাড়া কোনো মেহমানের জন্য জায়েয নেই যে, নফল রোজা রাখবে। কেননা অবহিত না করলে মেজবান সমস্যায় পড়ে যাবে। মেহমানের জন্য বাজার খরচ, রান্না-বান্না ও যাবতীয় খরচ যা হয়েছে সবই বিফলে যাবে। ফলে মেজবান দুঃখ পাবে। তাই এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
খাওয়ার সময় মেহমানের উপস্থিত থাকা উচিত:
মনে করুন, মেজবানের বাসায় খানার জন্য নির্দিষ্ট একটা সময় আছে। অথচ মেহমান তখন কোথাও চলে গেল। এতে মেজবান কষ্ট পায়। মেহমানের খোঁজে মেজবান উদ্বিগ্ন হয়, নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাঘাত ঘটে, না খেয়ে মেহমানের জন্য বসে থাকতে হয়। এতসব বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় হলো, মেহমান যথাসময়ে উপস্থিত থাকবে। কোনো কারণে বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আগেই জানিয়ে দেবে।
মেজবানকে কষ্ট দেয়া কবীরা গুনাহ:
শুধু নামাজ, রোজা, জিকির ও তাসবীহর নাম দ্বীন নয়। দ্বীন অনেক বিস্তৃত। এসব বিষয়ও দ্বীনের অংশ। অথচ আমরা মনে করি, এগুলো দ্বীন বহির্ভূত। বড় বড় দ্বীনদার ব্যক্তি ইসলামের সামাজিক শিষ্টাচারের ব্যাপারে একেবারে অজ্ঞ। যার কারণে তারাও অনায়াসে গুনাহে লিপ্ত হয়ে থাকেন। মনে রাখবেন, আদবের তোয়াক্কা না করলে মেজবান কষ্ট পাবেন।
আর কথায় বা কাজে এক মুসলমানকে আরেক মুসলমানের কষ্ট দেয়া কবীরা গুনাহ। যেমনিভাবে মদপান করা, চুরি করা, যিনা করা কবীরা গুনাহ। সুতরাং আচরণের মাধ্যমে যদি মেজবানকে কষ্ট দেয়া হয়, তাহলে এটাও তো মুসলমানকে কষ্ট দেয়া হলো। এবং এটাও কবীরা গুনাহ।
মহান রাব্বিুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উক্ত বিষয়ে সঠিক আমল করার তাওফীক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।